
বাংলাদেশ ক্রিকেট আজ বিশ্বমঞ্চে এক সমীহ জাগানো নাম। বিশেষ করে ওয়ানডে ক্রিকেটে (ODI) টাইগাররা এখন যেকোনো পরাশক্তিকে মাটিতে নামিয়ে আনার ক্ষমতা রাখে। তবে এই পথচলাটা সহজ ছিল না। গত আড়াই দশকে বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে, কোটি ভক্তের চোখ অশ্রুতে ভাসিয়ে আর আনন্দে আত্মহারা করে বাংলাদেশ দল আমাদের উপহার দিয়েছে অসংখ্য স্মরণীয় ম্যাচ।
কিছু জয় শুধু খাতার কলমে জয় নয়, সেগুলো একেকটি ইতিহাস। সেই ম্যাচগুলো বদলে দিয়েছে আমাদের ক্রিকেটের মানসিকতা, তৈরি করেছে নতুন নতুন বিশ্বসেরা তারকা। আজকের এই বিস্তারিত আর্টিকেলে আমরা টাইম মেশিনে চড়ে পেছন ফিরে তাকাবো এবং ক্রিকেট ইতিহাসের পাতা থেকে ইন-ডেপথ অ্যানালাইসিস বা পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের মাধ্যমে খুঁজে বের করব Greatest ODI Matches in Bangladesh Cricket History।
আপনি যদি একজন খাঁটি cricketপ্রেমী হয়ে থাকেন, তবে এই তালিকাটি আপনার স্মৃতিতে জমানো ধুলোবালি ঝেড়ে আবার সেই টানটান উত্তেজনার দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। চলুন, উল্টো ক্রমানুসারে (১০ থেকে ১) জেনে নেওয়া যাক সেই ম্যাচগুলোর আদ্যোপান্ত এবং তাদের সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ডের রেকর্ড টেবিল।
Table of Contents
১০. বাংলাদেশ বনাম ইংল্যান্ড (২০১১ বিশ্বকাপ, চট্টগ্রাম)

ম্যাচের পটভূমি ও প্রেক্ষাপট
২০১১ সালের ঘরের মাঠের বিশ্বকাপ। বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের উন্মাদনা তখন আকাশচুম্বী। তবে গ্রুপ পর্বের একটি ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে মাত্র ৫৮ রানে অলআউট হওয়ার পর পুরো দেশ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। দলের ওপর মানুষের ক্ষোভ আর হতাশা তখন চরমে। এমন একটি মানসিক পরিস্থিতিতে চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। এই ম্যাচে হারলে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় প্রায় নিশ্চিত ছিল। তাই ম্যাচটি ছিল অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
ম্যাচের মূল ঘটনা ও টার্নিং পয়েন্ট
টসে জিতে প্রথমে ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্ত নেন তৎকালীন অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। টাইগার বোলারদের নিয়ন্ত্রিত এবং বুদ্ধিদীপ্ত বোলিংয়ে ইংল্যান্ডের শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপ নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে। জোনাথন ট্রটের ৩৯ এবং ইয়ান বেলের সংগৃহীত ৫ রানের পর মিডল অর্ডারে রবি বোপারা দলের হাল ধরেন। শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডকে নির্ধারিত ৫০ ওভারে মাত্র ২২৫ রানে অলআউট করে দেয় বাংলাদেশ। আব্দুর রাজ্জাক ও নাঈম ইসলাম দারুণ ইকোনমিক্যাল বোলিং করেন।
২২৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশের ওপেনার ইমরুল কায়েস এক প্রান্ত আগলে রেখে ৬০ রানের একটি চমৎকার ইনিংস খেলেন। তবে মিডল অর্ডারে হঠাৎ ধস নামে। পল কলিংউড এবং গ্রেম সোয়ানের স্পিন ঘূর্ণিতে কুপোকাত হয়ে একপর্যায়ে মাত্র ১৬৯ রানে ৮ উইকেট হারিয়ে ম্যাচ থেকে সম্পূর্ণ ছিটকে যায় বাংলাদেশ। জয়ের জন্য তখনো প্রয়োজন ৫৭ রান, হাতে মাত্র ২ উইকেট! গ্যালারিতে তখন কান্নার রোল, কোটি মানুষের চোখ টিভি পর্দায় আটকে।
ঠিক তখনই রূপকথার নায়ক হয়ে হাজির হন নয় নম্বর ব্যাটসম্যান শফিউল ইসলাম এবং ঠান্ডা মাথার মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। শফিউল ক্রিজে এসেই কোনো ভয় না পেয়ে ওয়ানডে ক্যারিয়ারের সেরা ক্যামিও ইনিংসটি খেলা শুরু করেন। জেমস অ্যান্ডারসন এবং টিম ব্রেসনানকে কাউন্টার-অ্যাটাক করে ২৪ বলে ২৪ রানের এক অবিশ্বাস্য ঝড়ো ইনিংস খেলেন তিনি, যার মধ্যে ছিল ৪টি দৃষ্টিনন্দন চার। অন্য প্রান্তে তাকে যোগ্য সঙ্গ দেন রিয়াদ (২১*)। এই নবম উইকেট জুটির অবিশ্বাস্য ৫৮ রানের কল্যাণে বিশ্বমঞ্চে ইংল্যান্ডকে ২ উইকেটে হারিয়ে জয়ের উল্লাসে মাতে পুরো বাংলাদেশ। এই রোমাঞ্চকর জয়টি বিশ্ব ক্রিকেটের ইতিহাসে অন্যতম সেরা পুশ-ব্যাক হিসেবে গণ্য করা হয়।
| দল | স্কোর (ওভার) | প্রধান ব্যাটসম্যান | প্রধান বোলার | ম্যাচের ফলাফল |
|---|---|---|---|---|
| ইংল্যান্ড | ২২৫/১০ (৪৯.৪ ওভার) | জোনাথন ট্রট – ৬৭ (৯৯) | শফিউল ইসলাম – ৪/২১ (৮) | বাংলাদেশ ২ উইকেটে জয়ী (৪ বল বাকি থাকতে) |
| বাংলাদেশ | ২২৭/৮ (৪৯.২ ওভার) | ইমরুল কায়েস – ৬০ (১০০) | পল কলিংউড – ২/২৩ (৫) | ম্যাচ সেরা: শফিউল ইসলাম |
ALSO READ:
৯. বাংলাদেশ বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ (২০১৯ বিশ্বকাপ, টানটন)

ম্যাচের পটভূমি ও প্রেক্ষাপট
২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপটি ছিল ইংল্যান্ডের মাটিতে হাই-স্কোরিং টুর্নামেন্ট। টনটনের কাউন্টি গ্রাউন্ডটি ছিল তুলনামূলক ছোট, যেখানে বাউন্ডারি মারা সহজ। ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল তাদের দীর্ঘদেহী ফাস্ট বোলারদের দিয়ে শর্ট বলের স্ট্র্যাটেজি নিয়ে মাঠে নেমেছিল। বাংলাদেশের জন্য এই ম্যাচে জয় পাওয়া সেমিফাইনালের রেসে টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল।
ম্যাচের মূল ঘটনা ও টার্নিং পয়েন্ট
টসে হেরে প্রথমে ফিল্ডিং করতে নেমে ক্যারিবীয়দের দানবীয় ব্যাটিংয়ের মুখোমুখি হতে হয় বাংলাদেশকে। শাই হোপের ১২১ বলে ৯৬, এভিন লুইসের ৭০ এবং শেষ দিকে শিমরন হেটমায়ারের মাত্র ২৬ বলে ৫০ রানের টর্নেডো ইনিংসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৩২১ রানের এক পাহাড়সম পুঁজি দাঁড় করায়। ৩২২ রানের এই বিশাল লক্ষ্য তাড়া করা তৎকালীন বাংলাদেশের ওডিআই ইতিহাসের জন্য ছিল এক বিরাট মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ।
কিন্তু সেদিন মাঠে নেমেছিল এক নতুন ডেসপারেট বাংলাদেশ। তামিম ইকবাল (৪৮) এবং সৌম্য সরকারের (২৯) দারুণ শুরুর পর ওয়ানডে ইতিহাসের অন্যতম সেরা কাউন্টার-অ্যাটাকিং ব্যাটিং প্রদর্শন করেন সাকিব আল হাসান এবং লিটন দাস। সাকিব মাত্র ৯৯ বলে খেলেন ১২৪* রানের এক অপরাজিত মহাকাব্যিক ইনিংস, যা তাকে টুর্নামেন্টের শীর্ষ রান সংগ্রাহকের তালিকায় নিয়ে যায়।
অন্য প্রান্তে, বিশ্বকাপে নিজের প্রথম ম্যাচ খেলতে নামা লিটন দাস কোনো চাপ অনুধাবন না করে ৬৯ বলে ৯৪* রানের এক রাজকীয় ইনিংস খেলেন। শ্যানন গ্যাব্রিয়েলের এক ওভারে লিটনের টানা তিনটি ছক্কা আজও ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে গেঁথে আছে। এই দুই ব্যাটসম্যানের অবিচ্ছিন্ন ১৮৯ রানের তাণ্ডবে ৪১.৩ ওভারেই, অর্থাৎ ৫১ বল বাকি থাকতেই ৩ উইকেটে ৩২২ রান তুলে জয় সুনিশ্চিত করে বাংলাদেশ। এটি ছিল রান তাড়া করার ক্ষেত্রে Greatest ODI Matches in Bangladesh Cricket History তালিকার অন্যতম সেরা ও আধিপত্য বিস্তারকারী জয়।
| দল | স্কোর (ওভার) | প্রধান ব্যাটসম্যান | প্রধান বোলার | ম্যাচের ফলাফল |
|---|---|---|---|---|
| ওয়েস্ট ইন্ডিজ | ৩২১/৮ (৫০ ওভার) | শাই হোপ – ৯৬ (১২১) | মুস্তাফিজুর রহমান – ৩/৫৯ (৯) | বাংলাদেশ ৭ উইকেটে জয়ী (৫১ বল বাকি থাকতে) |
| বাংলাদেশ | ৩২২/৩ (৪১.৩ ওভার) | সাকিব আল হাসান – ১২৪* (৯৯) | আন্দ্রে রাসেল – ১/৪২ (৬) | ম্যাচ সেরা: সাকিব আল হাসান |
৮. বাংলাদেশ বনাম ভারত (১ম ওয়ানডে, ২০২২ দ্বিপাক্ষিক সিরিজ, মিরপুর)

ম্যাচের পটভূমি ও প্রেক্ষাপট
রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি, কেএল রাহুল সমৃদ্ধ শক্তিশালী ভারত দল যখন তিন ম্যাচের ওডিআই সিরিজ খেলতে ঢাকায় আসে, তখন মিরপুরের গ্যালারি ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। ভারত সবসময়ই বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দী, আর ঘরের মাঠে ভারতের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচটি জেতা সিরিজের ভাগ্য নির্ধারণের জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ম্যাচের মূল ঘটনা ও টার্নিং পয়েন্ট
টসে জিতে প্রথমে বোলিংয়ের সাহসী সিদ্ধান্ত নেন লিটন দাস (নিয়মিত অধিনায়ক তামিম ইকবালের অনুপস্থিতিতে)। মিরপুরের চিরচেনা স্লো এবং স্পিন ট্র্যাকে ঘূর্ণিজাদু দেখান বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। তিনি মাত্র ৩৬ রান খরচ করে একাই শিকার করেন ৫টি উইকেট। তাকে যোগ্য সঙ্গ দেন পেসার এবাদত হোসেন (৪/৪৭)। এই দুই বোলারের সাঁড়াশি আক্রমণে ভারতকে মাত্র ১৮৬ রানে গুটিয়ে দেয় টাইগাররা। কেএল রাহুল একাই ৭৩ রান করে প্রতিরোধ গড়েছিলেন।
সহজ লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুটা ভালো হলেও ভারতীয় বোলার মোহাম্মদ সিরাজ এবং শার্দুল ঠাকুরের বোলিং তোপের মুখে খেই হারিয়ে ফেলে বাংলাদেশের মিডল এবং লোয়ার অর্ডার। দ্রুত উইকেট পতনের কারণে একপর্যায়ে স্কোর দাঁড়ায় ১৩৬ রানে 9 উইকেট! ভারতের জয় তখন সময়ের ব্যাপার মাত্র, ধারাভাষ্যকাররাও ভারতের জয় উদযাপন শুরু করে দিয়েছিলেন। জয়ের জন্য তখনো দরকার ৫১ রান, হাতে আছে মাত্র ১টি উইকেট। ক্রিজে অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজ এবং শেষ ব্যাটসম্যান ‘কাটার মাস্টার’ মুস্তাফিজুর রহমান।
সেখান থেকে মিরাজ যা করলেন, তাকে অলৌকিক বললেও কম হবে। ভারতের বিশ্বমানের বোলিং আক্রমণ এবং স্লেজিংকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মুস্তাফিজকে সাথে নিয়ে ৩৯ বলে ৩৮* রানের এক অবিশ্বাস্য এবং অসম সাহসী ইনিংস খেলেন মিরাজ। মুস্তাফিজও ১০* রান করে দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে যান। লোকেশ রাহুল মিরাজের একটি সহজ ক্যাচ মিস করলে ম্যাচ বাংলাদেশের দিকে হেলে পড়ে। শেষ উইকেটের এই ঐতিহাসিক পার্টনারশিপে ভারতকে ১ উইকেটে হারিয়ে ক্রিকেট বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয় বাংলাদেশ।
| দল | স্কোর (ওভার) | প্রধান ব্যাটসম্যান | প্রধান বোলার | ম্যাচের ফলাফল |
|---|---|---|---|---|
| ভারত | ১৮ body/১০ (৪১.২ ওভার) | কেএল রাহুল – ৭৩ (৭০) | সাকিব আল হাসান – ৫/৩৬ (১০) | বাংলাদেশ ১ উইকেটে জয়ী (২৪ বল বাকি থাকতে) |
| বাংলাদেশ | ১৮৭/৯ (৪৬ ওভার) | লিটন দাস – ৪১ (৬৩), মিরাজ – ৩৮* | মোহাম্মদ সিরাজ – ৩/৩২ (১০) | ম্যাচ সেরা: মেহেদী হাসান মিরাজ |
৭. বাংলাদেশ বনাম অস্ট্রেলিয়া (২য় ওয়ানডে, ২০২৬ দ্বিপাক্ষিক সিরিজ, ঢাকা)

ম্যাচের পটভূমি ও প্রেক্ষাপট
২০২৬ সালের জুন মাসটি বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। দীর্ঘ ২১ বছর ধরে ওয়ানডে ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়াকে দ্বিপাক্ষিক সিরিজে না হারানোর যে আক্ষেপ ছিল, তা ঘুচানোর সুবর্ণ সুযোগ আসে এই হোম সিরিজে। প্রথম ম্যাচে জয়ের পর, সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে মিরপুরের শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হয় দুই দল। পুরো দেশের মানুষের চোখ ছিল এই ম্যাচের দিকে, কারণ এই ম্যাচ জিতলেই তৈরি হবে নতুন ইতিহাস।
ম্যাচের মূল ঘটনা ও টার্নিং পয়েন্ট
টসে জিতে ফিল্ডিংয়ে নেমেই আগুন ঝরান বাংলাদেশের পেস ব্যাটারি—তাসকিন আহমেদ এবং মুস্তাফিজুর রহমান। অস্ট্রেলিয়ার দুই ওপেনার ট্রাভিস হেড এবং মিচেল মার্শকে প্রথম ওভারেই সাজঘরে ফেরত পাঠান তাসকিন। পরের ওভারে মুস্তাফিজ এসে স্টিভ স্মিথকে এলবিдব্লিউর ফাঁদে ফেলেন। ম্যাচের স্কোরবোর্ড তখন অবিশ্বাস্য এক রূপ নেয়: ০/৩ (৩ উইকেটে ০ রান)! শুরুর সেই মহাধাক্কা সামলে গ্লেন ম্যাক্সওয়েল এবং ক্যামেরন গ্রিনের ব্যাটে চড়ে অস্ট্রেলিয়া কোনোমতে ১৮৭/৮ রান তুলতে সক্ষম হয়। মুস্তাফিজ ২৭ রানে ৩টি এবং তাসকিন ৩৩ রানে ৩টি উইকেট নেন।
পরবর্তীতে বৃষ্টির কারণে খেলা কিছুক্ষণ বন্ধ থাকে এবং ডাকওয়ার্থ-লুইস (DLS) পদ্ধতিতে বাংলাদেশের সামনে নতুন লক্ষ্য দাঁড়ায় ৪১ ওভারে ১৯২ রান। রান তাড়া করতে নেমে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত (৪২) ও ওপেনার সৌম্য সরকার (৪২) শক্ত ভিত গড়ে দেন। তবে মিডল অর্ডারে দ্রুত ২টি উইকেট পড়ে গেলে কিছুটা চাপ সৃষ্টি হয়।
শেষদিকে তাওহীদ হৃদয়ের দায়িত্বশীল ৪০* এবং লিটন দাসের ক্যামিও ইনিংসের ওপর ভর করে অজিদের ৫ উইকেটে হারিয়ে প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দ্বিপাক্ষিক ওয়ানডে সিরিজ জয়ের ঐতিহাসিক গৌরব অর্জন করে বাংলাদেশ। যা নিঃসন্দেহে Greatest ODI Matches in Bangladesh Cricket History-র পাতায় আধুনিক যুগের শ্রেষ্ঠ দ্বিপাক্ষিক সিরিজ জয় হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
| দল | স্কোর (ওভার) | প্রধান ব্যাটসম্যান | প্রধান বোলার | ম্যাচের ফলাফল |
|---|---|---|---|---|
| অস্ট্রেলিয়া | ১৮৭/৮ (৫০ ওভার) | গ্লেন ম্যাক্সওয়েল – ৫৪ (৬২) | মুস্তাফিজুর রহমান – ৩/২৭ (১০) | বাংলাদেশ ৫ উইকেটে জয়ী (DLS পদ্ধতিতে) |
| বাংলাদেশ | ১৯৫/৫ (৩৮.২ ওভার) | নাজমুল শান্ত – ৪২, তাওহীদ – ৪০* | মিচেল স্টার্ক – ২/৩৮ (৮) | ম্যাচ সেরা: মুস্তাফিজুর রহমান |
৬. বাংলাদেশ বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা (২০১৯ বিশ্বকাপ, ওভাল)

ম্যাচের পটভূমি ও প্রেক্ষাপট
২০১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের শুরুটা কেমন হবে, তা নিয়ে অনেক সংশয় ছিল। প্রথম ম্যাচেই প্রতিপক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকা, যাদের ডেল স্টেইন, কাগিসো রাবাদা এবং ইমরান তাহিরের মতো বিশ্বমানের বোলার ছিল। ওভালের উইকেট ছিল ব্যাটিং সহায়ক, তবে সবুজের সামান্য আভা থাকায় পেসারদের জন্য বাডতি সুবিধা ছিল।
ম্যাচের মূল ঘটনা ও টার্নিং পয়েন্ট
টসে জিতে দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক ফাফ দু প্লেসি বাংলাদেশকে প্রথমে ব্যাটিংয়ের আমন্ত্রণ জানান, এই আশায় যে তাদের পেসাররা শুরুতেই বাংলাদেশকে চেপে ধরবে। কিন্তু তার সেই পরিকল্পনাকে ধুলোয় মিশিয়ে দেন সৌম্য সরকার (৪২) এবং তামিম ইকবাল। এরপর দৃশ্যপটে আসেন দেশের ইতিহাসের দুই সবচেয়ে অভিজ্ঞ সেনানি—সাকিব আল হাসান ও মুশফিকুর রহিম।
সাকিবের ৮৪ বলে ৭৫ এবং মুশফিকের ৮০ বলে ৭৮ রানের ওপর ভর করে বাংলাদেশ নির্ধারিত ৫০ ওভারে ওয়ানডে বিশ্বকাপে নিজেদের সর্বোচ্চ ৩৩০/৬ রানের পাহাড় গড়ে। শেষ দিকে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের ৩৩ বলে ৪৬* রানের ক্যামিও ইনিংসটি স্কোরকে ৩৩০ এ নিয়ে যেতে বড় ভূমিকা রাখে।
৩৩১ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরু থেকেই নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে দক্ষিণ আফ্রিকা। কুইন্টন ডি কক (২৩) এবং এইডেন মার্করামের (৪৫) বিদায়ের পর ফাফ দু প্লেসি (৬২) চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সাকিব আল হাসানের নিয়ন্ত্রিত স্পিন এবং মুস্তাফিজুর রহমানের (৩/৬৭) কাটার-যাদু প্রোটিয়াদের রান রেটের গতি কমিয়ে দেয়।
শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকাকে ৩০৯ রানে আটকে রেখে ২১ রানের এক দুর্দান্ত ও ঐতিহাসিক জয় পায় বাংলাদেশ। এই ম্যাচটি প্রমাণ করেছিল যে, বাংলাদেশ আর কোনো অঘটন বা ভাগ্যের জোরে জেতার দল নয়, বরং নিজেদের স্কিল ও সামর্থ্যের জোরেই যেকোনো বড় দলকে অনায়াসে হারাতে পারে।
| দল | স্কোর (ওভার) | প্রধান ব্যাটসম্যান | প্রধান বোলার | ম্যাচের ফলাফল |
|---|---|---|---|---|
| বাংলাদেশ | ৩৩০/৬ (৫০ ওভার) | মুশফিকুর রহিম – ৭৮ (৮০) | মুস্তাফিজুর রহমান – ৩/৬৭ (১০) | বাংলাদেশ ২১ রানে জয়ী |
| দক্ষিণ আফ্রিকা | ৩০৯/৮ (৫০ ওভার) | ফাফ দু প্লেসি – ৬২ (৫৩) | ইমরান তাহির – ২/৫৭ (১০) | ম্যাচ সেরা: সাকিব আল হাসান |
৫. বাংলাদেশ বনাম নিউজিল্যান্ড (২০১৭ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি, কার্ডিফ)

ম্যাচের পটভূমি ও প্রেক্ষাপট
আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির গ্রুপ পর্বের এই ম্যাচটি ছিল অঘোষিত কোয়ার্টার ফাইনাল। কার্ডিফের সোফিয়া গার্ডেন্সের আকাশ ছিল মেঘলা, যা পেসারদের জন্য সুইং পাওয়ার জন্য একদম আদর্শ কন্ডিশন। নিউজিল্যান্ডের সুইং বোলারদের বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের কন্ডিশনে খেলা সবসময়ই যেকোনো এশিয়ান দলের জন্য সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা।
ম্যাচের মূল ঘটনা ও টার্নিং পয়েন্ট
টসে জিতে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে নিউজিল্যান্ড কেন উইলিয়ামসনের ৫৭ এবং রস টেইলরের ৬৩ রানের ওপর ভর করে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৮ উইকেটে ২৬৫ রান তোলে। বাংলাদেশের পক্ষে মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত মাত্র ৩ ওভারে ১৩ রান দিয়ে ৩টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট নিয়ে কিউইদের রান ৩০০-এর নিচে আটকে রাখেন।
২৬৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাটিং বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়। কিউই পেসার টিম সাউদি ও ট্রেন্ট বোল্টের মারাত্মক সুইং ও সিম মুভমেন্টের সামনে মাত্র ৩৩ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় বাংলাদেশ। তামিম ইকবাল, সাব্বির রহমান, সৌম্য সরকার এবং মুশফিকুর রহিম সবাই খাতা খোলার আগেই বা অল্প রানে প্যাভিলিয়নে ফেরত যান। স্টেডিয়ামে উপস্থিত সমর্থকরা তখন আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন।
সেখান থেকে শুরু হয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা কামব্যাক স্টোরি। ক্রিজে জুটি বাঁধেন দেশের দুই সেরা ক্রাইসিস ম্যান—সাকিব আল হাসান এবং মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। দুজনে মিলে পঞ্চম উইকেটে ২২৪ রানের এক অবিশ্বাস্য ও রেকর্ডব্রেকিং পার্টনারশিপ গড়ে তোলেন। সাকিব ১১৫ বলে ১১৪ রানের এক রাজকীয় ইনিংস খেলেন এবং মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ১০৭ বলে ১০২* রান করে অপরাজিত থাকেন। দুজনের ব্যাক-টু-ব্যাক সেঞ্চুরির ওপর ভর করে ৫ উইকেটের এক রূপকথার জয় পায় বাংলাদেশ, যা টাইগারদের ওডিআই ইতিহাসের প্রথম আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনালে নিয়ে যায়।
| দল | স্কোর (ওভার) | প্রধান ব্যাটসম্যান | প্রধান বোলার | ম্যাচের ফলাফল |
|---|---|---|---|---|
| নিউজিল্যান্ড | ২৬৫/৮ (৫০ ওভার) | রস টেলর – ৬৩ (৮২) | মোসাদ্দেক হোসেন – ৩/১৩ (৩) | বাংলাদেশ ৫ উইকেটে জয়ী (১৬ বল বাকি থাকতে) |
| বাংলাদেশ | ২৬৮/৫ (৪৭.২ ওভার) | সাকিব আল হাসান – ১১৪ (১১৫) | টিম সাউদি – ৩/৪৫ (৯) | ম্যাচ সেরা: সাকিব আল হাসান |
৪. বাংলাদেশ বনাম ইংল্যান্ড (২০১৫ বিশ্বকাপ, অ্যাডিলেড)

ম্যাচের পটভূমি ও প্রেক্ষাপট
২০১৫ সালের অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের মাটিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া টুর্নামেন্ট। অ্যাডিলেড ওভালের এই বাуন্সি উইকেটে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হয়েছিল বাংলাদেশ। কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার সমীকরণ ছিল স্পষ্ট—ইংল্যান্ডকে হারাতেই হবে। ইংলিশ মিডিয়া ম্যাচ শুরুর আগেই বাংলাদেশকে উড়িয়ে দিয়েছিল, যা টাইগারদের মনে বাড়তি জেদ তৈরি করে।
ম্যাচের মূল ঘটনা ও টার্নিং পয়েন্ট
টসে হেরে প্রথমে ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুতেই বিপর্যয়ে পড়ে বাংলাদেশ। মাত্র ৮ রানেই সাজঘরে ফেরেন দুই ওপেনার। তবে এরপর পুরো ম্যাচের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন সাইলেন্ট কিলার মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। ওয়ানডে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে একটি ঐতিহাসিক এবং দৃষ্টিনন্দন সেঞ্চুরি (১৩৮ বলে ১০৩ রান) হাঁকান তিনি। মুশফিকুর রহিমের ঝোড়ো ৮৯ রানের সৌজন্যে বাংলাদেশ নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৭ উইকেটে ২৭৫ রানের এক লড়াকু পুঁজি পায়।
২৭৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ইংল্যান্ড ম্যাচটি প্রায় নিজেদের পকেটে পুরে ফেলেছিল। ইয়ান বেল (৬৩) এবং জো রুটের ব্যাটিংয়ের ওপর ভর করে তারা ভালো অবস্থানে ছিল। তবে ম্যাচের মূল মোড় ঘুরিয়ে দেন মাশরাফি বিন মর্তুজা এবং রুবেল হোসেন। রুবেল নিজের গতি এবং রিভার্স সুইং দিয়ে ইংলিশ মিডল অর্ডারকে ধ্বংস করে দেন।
ম্যাচের শেষ ওভারে যখন ইংল্যান্ডের জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ১৬ রান, রুবেল হোসেন দুর্দান্ত দুটি ইয়র্কারে ক্রিস ওকস এবং জেমস অ্যান্ডারসনকে বোল্ড করে বাংলাদেশকে ১৫ রানের এক অবিস্মরণীয় জয় এনে দেন। এই জয়ের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে বাংলাদেশ এবং বিশ্ব ক্রিকেটের জনক ইংল্যান্ডকে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় করে দেয়। এটি Greatest ODI Matches in Bangladesh Cricket History-র অন্যতম সবচেয়ে আবেগময় মুহূর্ত।
| দল | স্কোর (ওভার) | প্রধান ব্যাটসম্যান | প্রধান বোলার | ম্যাচের ফলাফল |
|---|---|---|---|---|
| বাংলাদেশ | ২৭৫/৭ (৫০ ওভার) | মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ – ১০৩ (১৩৮) | রুবেল হোসেন – ৪/৫৩ (৯.৩) | বাংলাদেশ ১৫ রানে জয়ী |
| ইংল্যান্ড | ২৬০/১০ (৪৮.৩ ওভার) | জস বাটলার – ৬৫ (৫২) | জেমস অ্যান্ডারসন – ২/৪৫ (১০) | ম্যাচ সেরা: মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ |
৩. বাংলাদেশ বনাম ভারত (২০০৭ বিশ্বকাপ, পোর্ট অব স্পেন)

ম্যাচের পটভূমি ও প্রেক্ষাপট
২০০৭ সালের ওয়েস্ট ইন্ডিজ বিশ্বকাপ। শচীন টেন্ডুলকার, রাহুল দ্রাবিড়, সৌরভ গাঙ্গুলী, যুবরাজ সিং, বীরেন্দর শেবাগ, মহেন্দ্র সিং ধোনিদের নিয়ে গড়া ভারত দল তখন বিশ্বজয়ের অন্যতম দাবিদার এবং টুর্নামেন্টের সবচেয়ে ফেভারিট দল। অন্যদিকে বাংলাদেশ দলে তখন একঝাঁক অনূর্ধ্ব-১৯ থেকে আসা তরুণদের মেলা, যাদের বিশ্বমঞ্চে খেলার অভিজ্ঞতা ছিল নগতন্ন।
ম্যাচের মূল ঘটনা ও টার্নিং পয়েন্ট
পোর্ট অব স্পেনের কুইন্স পার্ক ওভালে টসে জিতে প্রথমে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় ভারত। কিন্তু মাশরাফি বিন মর্তুজার বিধ্বংসী ও গতিময় সুইং বোলিংয়ের সামনে শুরুতেই কোণঠাসা হয়ে পড়ে ভারতের ‘ফ্যাব ফোর’ ব্যাটিং লাইনআপ। বীরেন্দর শেবাগকে মাত্র ২ রানে বোল্ড করে ধসের সূচনা করেন মাশরাফি। আব্দুর রাজ্জাক (৩/৩৮) এবং মোহাম্মদ রফিকের (৩/৩৫) স্পিন ঘূর্ণিতে শচীন ও ধোনিরা দাঁড়াতেই পারেননি। মাশরাফির ৪ ওডিআই উইকেটের কামড়ে মাত্র ১৯১ রানেই অলآউট হয়ে যায় শক্তিশালী ভারত।
১৯২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বিশ্বমঞ্চে ভয়ডরহীন ক্রিকেটের এক নতুন যুগ সূচনা করেন ১৯ বছর বয়সী এক তরুণ ওপেনার—তামিম ইকবাল। ভারতীয় তারকা পেসার জহির খানকে ক্রিজ থেকে বেরিয়ে এসে যেভাবে তিনি ডাউন দ্য উইকেটে এসে এক চোখ ধাঁধানো ছক্কা মেরেছিলেন, তা আজও ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম আইকনিক শট। তামিমের ৫৩ বলে ৫১, সাকিব আল হাসানের ৫৩ এবং মুশফিকুর রহিমের অপরাজিত ৫৬ রানের ওপর ভর করে ৫ উইকেটের এক ঐতিহাসিক জয় পায় বাংলাদেশ। এই ম্যাচটি ভারতের বিশ্বস্ত ক্রিকেট অহংকার ভেঙে চুরমার করে দেয় এবং ভারতকে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে বাধ্য করে।
| দল | স্কোর (ওভার) | প্রধান ব্যাটসম্যান | প্রধান বোলার | ম্যাচের ফলাফল |
|---|---|---|---|---|
| ভারত | ১৯১/১০ (৪৯.৩ ওভার) | সৌরভ গাঙ্গুলী – ৬৬ (১২৯) | মাশরাফি মর্তুজা – ৪/৩৮ (৯.৩) | বাংলাদেশ ৫ wickets-এ জয়ী (৯ বল বাকি থাকতে) |
| বাংলাদেশ | ১৯২/৫ (৪৮.৩ ওভার) | মুশফিকুর রহিম – ৫৬* (১০৭) | মুনাফ প্যাটেল – ২/৩৯ (১০) | ম্যাচ সেরা: মাশরাফি বিন মর্তুজা |
২. বাংলাদেশ বনাম অস্ট্রেলিয়া (২০০৫ ন্যাটওয়েস্ট সিরিজ)

ম্যাচের পটভূমি ও প্রেক্ষাপট
২০০৫ সালের অস্ট্রেলিয়া দল ছিল ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা এবং অপরাজেয় দল। রিকি পন্টিংয়ের নেতৃত্বাধীন সেই দলে ছিলেন বিশ্বসেরা ওপেনার অ্যাডাম গিলক্রিস্ট ও ম্যাথু হেইডেন, মিডল অর্ডারে ড্যামিয়েন মার্টিন এবং মাইকেল ক্লার্ক। আর বোলিংয়ে ছিলেন গ্লেন ম্যাকগ্রা, জেসন গিলেস্পি ও মাইকেল ক্যাসপ্রোভিচ। এমন এক মহাশক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জয় পাওয়া তো দূরের কথা, ৫০ ওভার টিকতে পারাই ছিল অনেক বড় ব্যাপার।
ম্যাচের মূল ঘটনা ও টার্নিং পয়েন্ট
কার্ডিফের সোফিয়া গার্ডেন্সে টসে জিতে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে অস্ট্রেলিয়া নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৫ উইকেটে ২৪৯ রান তোলে। বাংলাদেশের বোলাররা সেদিন বেশ নিয়ন্ত্রিত বোলিং করেছিলেন, বিশেষ করে তাপস বৈশ্য ও মাশরাফি। ২৫০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই মাত্র শূন্য রানে ওপেনার নাফিস ইকবাল আউট হয়ে গেলে সবাই ভেবেছিল বাংলাদেশ বরাবরের মতো ১০০ রানের নিচে অলآউট হয়ে যাবে।
কিন্তু সেদিন কার্ডিফের মাঠে এক ঐশ্বরিক ও জাদুকরী ইনিংসের অবতারণা করেন ‘লিটল মাস্টার’ মোহাম্মদ আশরাফুল। অজিদের বিশ্বসেরা এবং স্লেজিং-নির্ভর বোলিং আক্রমণকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে মাত্র ১০১ বলে খেলেন ১০০ রানের এক অতিমানবীয় সেঞ্চুরি। ম্যাকগ্রা এবং গিলেস্পিকে যেভাবে তিনি ব্যাকফুট পাঞ্চ এবং ফ্লিক শটে বাউন্ডারি মারছিলেন, তা দেখে রিকি পন্টিং নির্বাক হয়ে গিয়েছিলেন।
অধিনায়ক হাবিবুল বাশারের ৪৭ এবং শেষ দিকে আফতাব আহমেদের সংগৃহীত ২১* রানের ওপর ভর করে ৪ বল বাকি থাকতেই ৫ উইকেটের এই মহাকাব্যিক জয়টি তুলে নেয় বাংলাদেশ। এই জয়টি পুরো ক্রিকেট বিশ্বের মিডিয়াকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল এবং ওডিআই ইতিহাসের সর্বকালের সেরা অঘটন (Greatest Upset) হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
| দল | স্কোর (ওভার) | প্রধান ব্যাটসম্যান | প্রধান বোলার | ম্যাচের ফলাফল |
|---|---|---|---|---|
| অস্ট্রেলিয়া | ২৪৯/৫ (৫০ ওভার) | ড্যামিয়েন মার্টিন – ৭৭ (১১২) | তাপস বৈশ্য – ৩/৬৯ (১০) | বাংলাদেশ ৫ উইকেটে জয়ী (৪ বল বাকি থাকতে) |
| বাংলাদেশ | ২৫০/৫ (৪৯.২ ওভার) | মোহাম্মদ আশরাফুল – ১০০ (১০১) | জেসন গিলেস্পি – ২/৪৬ (৯.২) | ম্যাচ সেরা: মোহাম্মদ আশরাফুল |
১. বাংলাদেশ বনাম পাকিস্তান (১৯৯৯ বিশ্বকাপ, নর্থহ্যাম্পটন)

ম্যাচের পটভূমি ও প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ এবং সবচেয়ে মহান ওডিআই ম্যাচ এটিই। ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো অংশ নিয়েছিল। স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে একটি জয় পেলেও পাকিস্তানের মতো বিশ্বমানের দলের বিরুদ্ধে জয় পাওয়া ছিল কল্পনাতীত। ওয়াসিম আকরামের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান দল তখন ইনজামাম-উল-হাক, সাঈদ আনোয়ার এবং শোয়েব আখতারদের নিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম প্রধান পরাশক্তি ছিল।
ম্যাচের মূল ঘটনা ও টার্নিং পয়েন্ট
নর্থহ্যাম্পটনে টসে হেরে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশ নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৯ উইকেটে ২২৩ রানের একটি সাধারণ পুঁজি পায়। ওপেনার শাহরিয়ার হোসেন বিদ্যুৎ ৩৯ এবং আকরাম খান ৪২ রানের মূল্যবান ইনিংস খেলেন। পাকিস্তানের শক্তিশালী বোলিংয়ের সামনে এই রান জেতার জন্য যথেষ্ট ছিল না বলেই মনে করা হচ্ছিল।
কিন্তু ২২৪ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রিত বোলিং ও চিতার মতো ফিল্ডিংয়ের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি পাকিস্তান। ম্যাচের প্রথম ওভারেই সাঈদ আনোয়ারকে রান আউট করে দুর্দান্ত সূচনা করেন খালেদ মাহমুদ সুজন। এরপর নিজের মিডিয়াম পেস বোলিংয়ের জাদু দেখিয়ে ইনজামাম-উল-হাক ও সেলিম মালিককে প্যাভিলিয়নের পথ দেখান তিনি। সুজন মাত্র ৩১ রান খরচ করে ৩টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উইকেট নেন।
পাকিস্তানের পুরো দল মাত্র ৪৪.৩ ওভারে ১৬১ রানে অলআউট হয়ে যায় এবং বাংলাদেশ 62 রানের এক ঐতিহাসিক ও অবিস্মরণীয় জয় ছিনিয়ে নেয়। এই জয়ের পরই বাংলাদেশের মানুষের ক্রিকেটপ্রেম এক অন্য মাত্রায় পৌঁছায় এবং এই অভাবনীয় সাফল্যের ওপর ভিত্তি করেই ২০০০ সালের ২৬ জুন বাংলাদেশ আইসিসির পূর্ণাঙ্গ টেস্ট স্ট্যাটাস লাভ করে। তাই এই ম্যাচটিকে Greatest ODI Matches in Bangladesh Cricket History-র সর্বশ্রেষ্ঠ ম্যাচ বা ‘মাদার অব অল ম্যাচেস’ বলা হয়।
| দল | স্কোর (ওভার) | প্রধান ব্যাটসম্যান | প্রধান বোলার | ম্যাচের ফলাফল |
|---|---|---|---|---|
| বাংলাদেশ | ২২৩/৯ (৫০ ওভার) | আকরাম খান – ৪২ (৬৬) | সাকলাইন মুশতাক – ৫/৩৫ (১০) | বাংলাদেশ ৬২ রানে জয়ী |
| পাকিস্তান | ১৬১/১০ (৪৪.৩ ওভার) | ওয়াসিম আকরাম – ২৯ (৫২) | খালেদ মাহমুদ সুজন – ৩/৩১ (১০) | ম্যাচ সেরা: খালেদ মাহমুদ সুজন |
উপসংহার
১৯৯৯ সালের নর্থহ্যাম্পটন থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের মিরপুরের অস্ট্রেলিয়া বধ—বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেটের এই দীর্ঘ পথচলা কোটি কোটি বাঙালির আবেগ, ভালোবাসা এবং ত্যাগের প্রতীক। এই ১০টি ম্যাচ কেবল ১০টি সাধারণ জয় নয়, বরং এগুলো একেকটি ঐতিহাসিক মাইলফলক যা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের মাথা উঁচিয়ে দাঁড়ানোর গল্প বলে। প্রতিটি ম্যাচই আমাদের ক্রিকেট সংস্কৃতিকে বদলে দিয়েছে এবং আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে শেষ বল পর্যন্ত বুক চিতিয়ে লড়াই করতে হয়।
টাইগারদের এই Greatest ODI Matches in Bangladesh Cricket History তালিকার ঐতিহাসিক জয়ের মধ্যে আপনার সবচেয়ে প্রিয় ম্যাচ কোনটি? কোন ম্যাচটি দেখার সময় আপনার হৃদস্পন্দন সবচেয়ে বেশি বেড়ে গিয়েছিল? নিচে কমেন্ট করে আমাদের সাথে শেয়ার করুন!
FAQs
১. ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ দলীয় স্কোর কত এবং এটি কোন ম্যাচে হয়েছিল?
উত্তর: ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ দলীয় স্কোর হলো ৩৪৯/৬। ২০২৩ সালের মার্চ মাসে সিলেটে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে এই রেকর্ড স্কোরটি গড়েছিল বাংলাদেশ।
২. ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের পক্ষে প্রথম সেঞ্চুরি করার গৌরব কার?
উত্তর: ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের পক্ষে প্রথম আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরি করেন মেহরাব হোসেন অপি। ১৯৯৯ সালে ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১০১ রানের ঐতিহাসিক ইনিংসটি খেলেছিলেন তিনি।
৩. ওয়ানডে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রথম সেঞ্চুরিয়ান কে?
উত্তর: ওয়ানডে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পক্ষে প্রথম সেঞ্চুরি করার গৌরব অর্জন করেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে অ্যাডিলেড ওভালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১০৩ রানের ম্যাচজয়ী ইনিংস খেলেন তিনি এবং এর পরের ম্যাচেই নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধেও তিনি সেঞ্চুরি করেন।
৪. বাংলাদেশ কত সালে এবং কোন জয়ের প্রেক্ষিতে আইসিসির টেস্ট স্ট্যাটাস পায়?
উত্তর: ১৯৯৯ বিশ্বকাপে শক্তিশালী পাকিস্তানকে হারানোর পর বাংলাদেশের ক্রিকেটে আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়। এর ফলশ্রুতিতে ২০০০ সালের ২৬ জুন বাংলাদেশ আইসিসির ১০ম পূর্ণাঙ্গ সদস্য হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ টেস্ট স্ট্যাটাস লাভ করে।
৫. দ্বিপাক্ষিক ওয়ানডে সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের প্রথম সিরিজ জয়টি কবে আসে?
উত্তর: ২০২৬ সালের জুন মাসে মিরপুরের শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশ প্রথম ওয়ানডে সিরিজ জয়ের ঐতিহাসিক রেকর্ড গড়ে। এর আগে ২০০৫ সালে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়াকে কার্ডিফে মাত্র ১টি ম্যাচে হারিয়েছিল, কিন্তু কোনো দ্বিপাক্ষিক সিরিজ জিততে পারেনি।
